আসমানী খাতুন আঁখি, রাজশাহী :
দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চল রাজশাহীতে মৌসুমের শেষভাগে এসে আমের বাজারে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। জেলার বৃহত্তম আমের হাট বানেশ্বরসহ পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট এবং মহানগরীর বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিনই ভিড় করছেন ক্রেতা ও পাইকাররা। মৌসুমের শুরুতে জনপ্রিয় ল্যাংড়া ও ক্ষীরশাপাত আমের সরবরাহ কমে এলেও বর্তমানে বাজার দখল করে আছে ফজলি, আম্রপালি ও লক্ষণভোগ জাতের আম। পাশাপাশি আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আমও বাজারে আসতে শুরু করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে রাজশাহীতে প্রায় ১৯ হাজার ৬০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমের চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি বিভাগের ধারণা, এ বছর জেলায় মোট আম উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি হতে পারে। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মধ্যে।
মৌসুমের শেষদিকে বেড়েছে আমের দাম –
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের আমের দাম মান ও গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় দামও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
বর্তমান বাজারে মনপ্রতি আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। ফজলির দাম রয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। লক্ষণভোগ বা লখনা আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। অন্যদিকে হাড়িভাঙা ও বারি-৪ জাতের আমের দাম মনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছে পাইকার –
বানেশ্বর হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে আমের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কম ছিল। তবে বর্তমানে ফজলি ও আম্রপালি আমের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত পাইকাররা সরাসরি হাটে এসে আম সংগ্রহ করছেন। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
গত কয়েক বছরের মতো এবারও রাজশাহীর আম ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে অনলাইনভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থা। জেলার বিভিন্ন এলাকার তরুণ উদ্যোক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাচ্ছেন।
এই ব্যবস্থার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমছে এবং উৎপাদকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতারাও সহজেই রাজশাহীর আম ঘরে বসে সংগ্রহ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
অনলাইনে আম বিক্রি বৃদ্ধির কারণে কুরিয়ার সেবাগুলোতেও ব্যাপক ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজশাহীর বিভিন্ন কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আম বুকিং হচ্ছে। দিন-রাত অব্যাহতভাবে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে আম পাঠানোর কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌসুমের এই সময়ে প্রতিদিন কয়েকশ টন আম কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে।
চাষিদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে –
মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অনেক বাগানে আগাম পেকে যাওয়া ও ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এতে চাষিদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। তবে বর্তমানে বাজারে সন্তোষজনক মূল্য পাওয়ায় সেই ক্ষতির অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা।
বিশেষ করে যেসব চাষি দেরিতে পাকা জাতের আম চাষ করেছেন, তারা আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
ক্রেতাদের নিরাপদ ও মানসম্মত আম নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অপরিপক্ব অবস্থায় বাজারজাতকরণ ঠেকাতে বিভিন্ন হাট-বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব –
রাজশাহীর অর্থনীতিতে আম অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতি বছরের মতো এবারও আমকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। চাষি, বাগান মালিক, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, কুরিয়ার কর্মী এবং অনলাইন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আম বাজারে আরও কিছুদিন থাকায় মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িক গতি অব্যাহত থাকবে। ফলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


