আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
কুড়িগ্রামের সীমান্তের জনপদে জীবন মানেই অসম সাহসের লড়াই। কাঁটাতারের এপারে যখনই ভারতের বিএসএফ আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তখনই বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে ঢাল হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় নারীরা। বিএসএফের উসকানি বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা কেবল দর্শক নন; বরং বিজিবি সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। সীমানা রক্ষায় নারীদের দুর্দমনীয় এই প্রতিরোধ ও সাহসিকতার কথা এখন সীমান্ত জনপদের এক পরিচিত আখ্যান।
গত ২৪ জুলাই কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী দাঁতভাঙা ইউনিয়নের সাতকড়াইবাড়ি গ্রামে বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বিএসএফের সব ধরনের আগ্রাসনের মুখে নিজেদের সাহসিকতার গল্প শোনান তারা। সাহসী এসব নারীর সঙ্গে প্রতিরোধের লড়াইয়ে অংশ নেয় স্থানীয় শিশু-কিশোররাও।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার সাতখাই গ্রামের বাসিন্দা মোছাঃ নুনিজান পরিবারসহ গত ৫০ বছর ধরে সীমান্তের কাছেই বসবাস করছেন। জীবনে অনেক রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেখেছেন তিনি। সীমান্তের অস্থিরতা বা গুলির ভয় সম্পর্কে জানতে চাইলে নুনিজান জানান, পরিস্থিতির প্রয়োজনে জীবন দিতেও দ্বিধা নেই তাদের। তিনি বলেন, যদি কেউ দেশের ক্ষতি করে, তাহলে তার পিছে জান লাগাতেই হবে। বড়াইবাড়ির গণ্ডগোলের সময় জনগণই তো বিজিবির পাশে ছিল।
তার মতে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব কেবল বাহিনীর একার নয়; বরং সেটি প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়।
আরেক গৃহবধূ মোছাঃ শাহানা বেগমের বাবা ও শ্বশুরবাড়ি সীমান্ত এলাকাতেই। সেখানেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা তার। তিনি জানান, বর্তমানে তাদের এলাকা বেশ শান্ত। কোনো ধরনের গোলাগুলি বা বড় কোনো ঝামেলা নেই। স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে বিজিবি সদস্যদের সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক। স্থানীয়রা বিজিবি সদস্যদের দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়মিত সাহায্য করেন। পাশাপাশি সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা রোহিঙ্গাসংক্রান্ত কোনো সন্দেহজনক তথ্য পেলে তারা বিজিবিকে ফোন করে দ্রুত অবগত করেন, যা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মোছাঃ শাহানা বেগম আরো জানান, সীমান্তের ওপারেও তাদের আত্মীয়স্বজন বসবাস করেন। হালচাষ করার সুবাদে ওপার থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মাঝেমধ্যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণ ছাড়া বিজিবির একার পক্ষে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে এই নারী বলেন, সীমান্তের অস্থিরতা ও গোলাগুলির উত্তাল সময়ে বিজিবি সদস্যরা যখন সরাসরি বর্ডারে অবস্থান করতে পারেননি, তখন রক্ষক হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামবাসী নিজেদের বাড়িঘর ও এলাকার মসজিদ খুলে দিয়েছিলেন তাদের জন্য। সেই কঠিন সময়ে বিজিবি সদস্যদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ এক সপ্তাহ তাদের ডিউটি পালনেও সরাসরি সহায়তা করেছিলেন স্থানীয়রা। এভাবেই সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি সদস্য এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে আসছেন, যা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সি গৃহবধূ মোছাঃ মেহের চানের বসবাস সীমান্ত এলাকায়। জীবিকার প্রয়োজনে নিয়মিত গরু-ছাগল নিয়ে শূন্যরেখার কাছাকছি যান। মেহেরচান বলেন, বিজিবি সদস্যরা তাদের সব সময় সতর্ক করেন, তারা যেন সাবধানে গরু-ছাগল চরান। তিনি জানান, বিএসএফ কখনো কোনো বিবাদে জড়ালে সীমান্ত এলাকার লোকজনের সঙ্গে এক হয়ে তারা বিজিবিকে সহযোগিতা করেন।
এই গৃহবধূদের মতো সীমান্তের কিশোর-তরুণরাও বিএসএফের আগ্রাসনের মুখে জীবনবাজি রেখে বিজিবির পাশে দাঁড়ায়। সীমান্তবর্তী দাঁতভাঙা ইউনিয়নের সাতকরাই গ্রামের দুই কিশোর মোহাম্মদ রাব্বি এবং ইসরাফিল ছোটবেলা থেকেই সীমান্তের একেবারে কাছে বেড়ে উঠেছে। জন্মগতভাবে তারা সীমান্তবর্তী পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত। তাই সীমান্ত এলাকায় বসবাস করা বা বিএসএফের উপস্থিতি তাদের কাছে ভয়ের কোনো কারণ নয়। সব সময়ই বিজিবিকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করার কথা জানায় তারা।
বিজিবি সদস্যরা যখন টহলে থাকেন, তখন তাদের পানি পান করানোসহ অন্যান্য ছোটখাটো সাহায্য তারা নিয়মিত করে থাকে। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে বা জরুরি কোনো তথ্য প্রয়োজন হলে তারা বিজিবিকে তাৎক্ষণিকভাবে তা অবহিত করে বলে জানায় ।
সীমান্ত এলাকায় পুশইন বা যেকোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতির সময় বিজিবির পাশে থাকার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে মোঃ ইসরাফিল হোসেন ও মোঃ রাব্বি ইসলাম। তারা জানায়, সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের যেকোনো ধরনের পুশইন বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা রুখতে তারা নিজেরাই এলাকা পাহারা দেয়। তারা দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ভবিষ্যতে যদি সীমান্তে যুদ্ধ বা বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হয়, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত।


