সিরাজুল ইসলাম রনি, রাজশাহী :
রাতের আঁধারে ট্রাকে করে মুরগির বিষ্ঠা ও পোল্ট্রি বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর নাবিল গ্রুপের মালিকানাধীন নাবা ফার্মের বিরুদ্ধে। গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট থেকে এসব বর্জ্য ট্রাকে করে রাজশাহীসহ বিভিন্ন উপজেলার খাল-বিল, পুকুর ও ফসলি জমির পাশে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, রাত ১২টা থেকে ভোররাত ৩টার মধ্যে বর্জ্যবাহী ট্রাকগুলো বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে এসব বর্জ্য ফেলে চলে যায়। এতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, মাছের পুকুর ও স্থানীয় পরিবেশ।
অভিযোগ রয়েছে, গোদাগাড়ী, পবা, দুর্গাপুর, তানোর, মোহনপুর ও নাচোলের বিভিন্ন এলাকায় এমন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে গোদাগাড়ীর গোমা ও ঝিকড়াপাড়া, পবা-দুর্গাপুরের মধ্যবর্তী ফলিয়ার বিল, রাজশাহী সিটি হাটের পাশের ড্রেন এবং কলার টিকর এলাকায় বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
গোদাগাড়ীর গোমা গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাঁকনহাটের ঝিকড়াপাড়া এলাকা থেকে মুরগির লিটার ট্রাকে করে নিয়ে এসে রাতের বেলায় বিভিন্ন খাল-বিল ও ফসলি জমির পাশে ফেলা হচ্ছে।
তাদের দাবি, বর্জ্য পানিতে মিশে যাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পুকুর ও খালের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও পুকুরের মাছ মারা যাওয়ারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কৃষকদের অভিযোগ, দূষিত বর্জ্য ফসলি জমির পাশে ফেলার কারণে জমি ও কৃষিকাজ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশুর পানির উৎসও দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলিয়ার বিলেও একই চিত্র।
রাজশাহী থেকে মোহনগঞ্জগামী সড়কের পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার মধ্যবর্তী ফলিয়ার বিল এলাকায়ও রাতের আঁধারে মুরগির বিষ্ঠা ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য ট্রাকে করে এনে বিলসংলগ্ন খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। দিনের বেলায় এসব বর্জ্য থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
এতে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী এবং ওই সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পায়নি। নাবা ফার্মের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ১০ মে ২০২৬ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়, গোদাগাড়ী উপজেলার ১ নম্বর গোদাগাড়ী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোমা গ্রামের বিভিন্ন খাল-বিল ও এলাকায় রাতের আঁধারে নাবা ফার্মের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি পানি দূষিত হয়ে পরিবেশ ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বর্জ্যবাহী গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাধাইড় ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আসগার আলীও রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
নাবা ফার্মের বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে এর আগেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত জুলাই মাসে গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিবেশ দূষণের দায়ে নাবা ফার্মকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন বলে জানা গেছে।
একই ঘটনায় ফার্মের কর্মচারী নাঈমকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই অভিযানের পর কয়েকদিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবারও বিভিন্ন এলাকায় মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলার ঘটনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নাবা ফার্ম থেকে বর্জ্য অপসারণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমেই এসব বর্জ্য বিভিন্ন এলাকায় ফেলা হচ্ছে।
এ ঘটনায় গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট কাদিপুর এলাকার হাদিসুজ্জামানের ছেলে শাহ জামাল এবং ঝিকড়াপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমানের ছেলে বাবুল সরকারের নাম স্থানীয়দের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যা বলছে নাবিল গ্রুপ :
অভিযোগের বিষয়ে নাবিল গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর মামুনুর রশিদ বলেন, “এ বিষয়ে আপনি ওই সেক্টরের জিএম বাবলু সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আপনাকে তথ্য দিতে পারবেন।”
পরে নাবা ফার্মের জিএম বাবলুর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, “বিষয়টি আমরা নতুন করে তদন্ত করব। দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু জরিমানা করে দায় শেষ না করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। কোথায়, কীভাবে এবং কার অনুমতিতে এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, তা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের প্রশ্ন—পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকার পরও যদি রাতের আঁধারে খাল-বিল ও ফসলি জমিতে বর্জ্য ফেলা হয়, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে?
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


