আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
বসতভিটার জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় এক সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকিসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম মোঃ মনিরুজ্জামান। তিনি কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিমছাট গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। মোঃ মনিরুজ্জামান দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক সংগ্রাম, ডেইলি কান্ট্রি টুডে ও নিউজ জি২৪.কম নিউজ পোর্টালের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত আছেন।
জানা গেছে, প্রায় চার যুগ আগে ১৯ শতাংশ জমি কিনে বসতি স্থাপন করে ওই সাংবাদিকের পরিবার। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন জমি দীর্ঘদিন যাবৎ জবরদখল করে রেখেছে মোঃ আলমগীর হোসেন (৪০) ও মোঃ আল আমিন (৩৬) নামের আপন দুই ভাই। তারা কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিমছাট গোপালপুর গ্রামের মৃত আসকর আলীর ছেলে। বাড়ির সীমানার সাথে অভিযুক্তদের একটি পুকুর ছিলো। প্রতি বছর বর্ষায় সেই পুকুরের পাড় ভেঙে প্রায় দুই শতাংশ জমি পুকুরে চলে যায়। তিন বছর আগে অভিযুক্তরা পুকুরটি ভরাট করে নতুন বাড়ি তৈরি করে সম্পূর্ণ জমি দখলে নেয়। ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও তার পরিবারের সদস্যরা বেসরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে গত বছরের অক্টোবরের ২০ তারিখে জমি মেপে নতুন সীমানা নির্ধারণ করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে যায় আলমগীর ও আল আমিন। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিকে জানানো হলে তারা মিমাংসার উদ্যোগ নেন। পরে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে প্রায় ৭০ জন বেসরকারি সার্ভেয়ার ৯ দিন জমি মাপামাপি করেন। জমি মাপ শেষে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর আগেই অভিযুক্ত দুই ভাই ও তাদের আত্মীয় স্বজন মব তৈরি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
এতে সার্ভেয়াররা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে নাই। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ এপ্রিল পুনরায় উভয় পক্ষের প্রায় ১৫ জন সার্ভেয়ার (আমিন) ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে জমি মাপা হয়। কিন্তু সেদিনও অভিযুক্তরা মব সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। পরে ওই দিন বিকেলে একটি সালিশী আপোষ নামা লেখা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয় পরবর্তী দিনে সার্ভেয়ারসহ জুড়ি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে উভয় পক্ষ তা মানতে বাধ্য থাকবে। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করে।
সর্বশেষ গত রবিবার (১৭ মে) উভয় পক্ষের ৬ জন সার্ভেয়ার জমি মাপা শুরু করেন। দিনভর জমি মাপার পর বিকেলে সিদ্ধান্ত জানাতে গেলে অভিযুক্ত দুই ভাই ও তাদের আত্মীয় স্বজন দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পরে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সার্ভেয়ার ও স্থানীয় ব্যক্তিরা ফিরে যান। পরে তিলাই ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মোঃ ওসমান গনি একদিনের সময় নিয়ে বিষয়টি মিমাংসার প্রস্তাব দিলে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পরিবার তা মেনে নেয়। কিন্তু অভিযুক্ত দুই ভাই ও তাদের পরিবার মীমাংসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাংবাদিকের পরিবারকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়।
সাংবাদিক মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, মোঃ আলমগীর হোসেন ও তার ভাই মোঃ আল আমিন আমাদের বাড়ির ভিটার প্রায় দুই শতক জমি দীর্ঘদিন যাবৎ জবর দখল করে রেখেছে। জমির দখল ছেড়ে দিতে বলায় তারা পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দেয়। আমার বড় ভাই মোঃ গোলজার হোসেন এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারপিট করে। সেই সাথে পরিবারের সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত ২৮ মার্চ ভূরুঙ্গামারী থানায় তাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। তিনি অভিযুক্তদের কবল থেকে রক্ষা পেতে সংবাদকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়ন জামায়াত ইসলামীর সভাপতি মোঃ সাইফুর রহমান জানান, জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য অন্তত ৫ দিন শালিসে গিয়েছি। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে বিষয়টি মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি।
কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মোঃ ওসমান গণি জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা জন্য উভয় পক্ষকে পুনরায় প্রস্তাব দেয়া হয়। সাংবাদিকের পরিবার প্রস্তাব মেনে নিলেও অপরপক্ষ সাড়া দেয়নি। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা পর ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ এস খোকন বলেন, আমরা সাংবাদিক সহকর্মীর সমস্যা সমাধানে একাধিকবার সেখানে গিয়েছি। কিন্তু অপর পক্ষের অসহযোগিতার কারণে সমস্যা সমাধান করা যায়নি। অভিযুক্ত দুই ভাইয়ের বক্তব্য জানতে মোঃ আলমগীর হোসেনের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।
ভূরুঙ্গামারী প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ আনোয়ারুল হক বলেন, ভূরুঙ্গামারীর পেশাজীবী সংবাদকর্মীদের অন্যায় ও উদ্দেশ্যমূলক ভাবে হয়রানি করা হলে সকল সংবাদকর্মীদের সাথে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হবে।
কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোঃ কামরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বিষয়টি আমি শুরু থেকেই অবগত। কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারিনি।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আজিম উদ্দিন জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা দায়ের করলে পুলিশ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের সহযোগিতা নিতে পারেন।

