আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা ২০ মিনিট। কুড়িগ্রাম জেলা সদরের চরযাত্রাপুর নৌঘাটে দেখা হলো ৫৫ বছর বয়সী মোঃ সামাদ আলীর সঙ্গে। নৌকা সারি করে রাখছেন ঘাটে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল হাটের দিন। তাই সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিনে থাকে বাড়তি চাপ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলতেই তিনি জানান, প্রার্থী তো দূরের কথা– সরকারি কোনো লোকজন এখন পর্যন্ত গণভোটের বিষয়ে কোনো প্রচার করেনি। এ সম্পর্কে জানেন না তিনি।
গতকাল সরেজমিন জেলার বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা গেছে, চরের সাধারণ মানুষ গণভোট কবে, কী বিষয়ে এবং কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে– এ বিষয়ে প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
নৌকায় এক ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিয়ে চর ইয়ুথনেট গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক মোঃ রাশেদ আলীর সঙ্গে। জীবনে এখন পর্যন্ত তিনি চারবার সরকারি ভোট দিয়েছেন। কিন্তু কখনও গণভোট দেননি। এ সম্পর্কে তাঁর এলাকায় কেউ কোনো ধরনের প্রচারণা না করায় প্রথম এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে শুনলেন গণভোট আসলে কি। জানালেন, এই চরে টেলিভিশন, রেডিও আর ইন্টারনেট না থাকায় কোনো মাধ্যম থেকে সেটি জানার সুযোগ নেই।
আরেকটু হেঁটে গিয়েই চর খেয়ার আলগার মোছাঃ মাজেদা বেগম নামের এক নারী ভোটারের সঙ্গে কথা হলো। জানালেন, সামনের মাসের ১২ তারিখ ভোট এটা জানলেও তাদের চরে এখনও কেউ ভোট চাইতে কিংবা গণভোটের প্রচার করতে আসেনি।
শুধু কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার চর যাত্রাপুর, চর ইয়ুথনেট কিংবা চর খেয়ার আলগার এই চিত্র নয়। কুড়িগ্রাম জেলার ৪২১টি চর ও দ্বীপ চরের অধিকাংশ চরেই এখন পর্যন্ত গণভোট সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণার কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। যার কারণে এসব নদী তীরবর্তীর দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষজন গণভোট সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন না। অধিকাংশ বয়স্ক ভোটার জানেই না গণভোট আসলে কি।
সরকার ঘোষিত গণভোটকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার কার্যক্রম শুরু হলেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে এর কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে পড়েনি। চরাঞ্চলের একাধিক এলাকায় সরকারি কোনো লিফলেট, মাইকিং, পোস্টার কিংবা সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
চরাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, তারা গণভোট শব্দটি আগেও শুনেছেন কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো সাধারণ কোনো নির্বাচন, আবার কেউ কেউ একে স্থানীয় বিষয় বলে ধরে নিয়েছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার পোড়ার চরের বাসিন্দা মোঃ মন্তাজ আলী বলেন, ‘হামার এট্টি টিভি নাই, কারেন্ট নাই। গণভোট এটা কি জানি না। আপনার মুখ থেকে প্রথম শুনলাম।’
পাশেই চর ভগবতীপুরের বাসিন্দা মোঃ এরশাদ আলী বলেন, ‘বিএনপি কন, এনসিপি কন; কোনো দলের কেউ আসে নাই ভোট চাইতে। আর গণভোট এটা কি– এরকম কিছু তো শুনলাম না। কেউ কিছু বলে নাই।’
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ঝুনকার চরের বাসিন্দা মোঃ আলম মিয়ার ভাষ্য, ‘আমাদের চরে এখন পর্যন্ত গণভোট নিয়ে কোনো সভা, মিটিং, আলোচনা কিছুই হয় নাই। আমি শহরে কাজ করি, লোকমুখে জানি, কিন্তু এটা আসলে কি আমি বুঝি নাই।’
কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার অষ্টমী চরের জেলে রতন দাস বলেন, ‘শহরে মানুষের মুখে মুখে শুনি এবার ভোট দুইটা। কিন্তু আমাগো চরে তো কেউ আসি কিছু কইল না। সরকারি ভোটের ব্যাপারে কিছু জানা নাই আমার।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুড়িগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহানুর রহমান খোকন বলেন, চরাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের সুযোগ সীমিত থাকায় সরকারি প্রচার ছাড়া তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব দুর্গম জায়গায় অতি দ্রুত গণভোট নিয়ে প্রচারণা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রতিমা রায় চৌধুরী বলেন, চরাঞ্চল একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন জনপদ হওয়ায় এখানে আলাদা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। সময়মতো প্রচার না হলে গণভোটে অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘আমরা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পৌঁছাতে পেরেছি। চরাঞ্চলে ওভাবে এখনও কাজ করা হয়নি। আমরা দ্রুত চরাঞ্চলগুলোতেও প্রচারণা চালাব। এ ব্যাপারে আপনাদের (সাংবাদিকদের) সহযোগিতা চাই। আপনারা এসব দুর্গম জায়গায় যান, কিছু আমাদের লিফলেট, পোস্টার নিয়ে মানুষকে জানাতে পারেন।’


