আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
‘আপনার সন্তান মাদকসহ পুলিশের হাতে আটক’– ফোনের ওপাশ থেকে এমন কথা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। এরপর নিজেকে পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা, জেল ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। সঙ্গে শোনানো হচ্ছে ওয়্যারলেস ও গাড়ির সাইরেনের শব্দ, কখনও আবার সন্তানের কান্নার মতো আওয়াজ। সবশেষে বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় এমন কৌশলে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের টার্গেট করে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একই ধরনের একাধিক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে অভিভাবকদের মাঝে। অভিযোগ রয়েছে, চিলমারী সদরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের বেছে বেছে ফোন করছে চক্রটি।
গত ১৩ আগস্ট চিলমারী সদরের একটি প্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ তামিমের বাবা, সাবেক ইউপি সদস্য এমদাদুল হকের কাছে ফোন আসে। ফোনে জানানো হয়, তাঁর ছেলেকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে। এরপর সন্তানের কান্নার মতো আওয়াজ শুনিয়ে তাঁকে আরও আতঙ্কিত করা হয়।
মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলা হয়। তবে বড় মেয়ের সন্দেহ হওয়ায় তিনি টাকা পাঠাননি। পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছেলেকে নিরাপদ দেখতে পান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক মোঃ এমদাদুল হক অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
এর আগে গত ২৯ জুন রমনা মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম আশেক আকাকে একই কায়দায় ফোন করে প্রতারক চক্র। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া তাঁর ছেলে গোলাম মোহাম্মদ ইসফাতুজ্জামান মাদকসহ আটক হয়েছেন বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ফোনে সন্তানের কান্নার শব্দও শোনানো হয়। পরে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরে ছেলে নিরাপদে আছেন এবং তিনি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে টাকা খুইয়েছেন জানতে পেরে চিলমারী থানায় অভিযোগ করেন।
গত ১৬ আগস্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মাসুদুর রহমান মাসুদ, মোঃ মোজাফ্ফর রহমান, মোছাঃ নাছরিন বেগম, মোঃ শফিকুল ইসলাম, মোঃ আয়নাল হক, মোঃ আব্দুল গাফ্ফার, মোঃ আব্দুর রহিম, মোছাঃ নাছিমা খাতুন, মোঃ সোহেল রানা, মোঃ মিজানুর রহমান মিজান, ব্যবসায়ী মোঃ সোহেল মিয়াসহ অনেককে টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয় চেয়ারম্যান মোঃ গোলাম আশেক আকা বলেন, ‘প্রতারকরা ফোন করে আমার সন্তানকে মাদকসহ আটকের কথা জানিয়ে টাকা দাবি করে। কথাবার্তা ও কৌশল এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, আমিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সন্তানের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে যাচাই করে বুঝতে পারি, আমি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে টাকা খুইয়েছি।’
কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় এ ধরনের প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে মোট কতজন অভিভাবক অর্থ খুইয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি চিলমারী থানা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী অভিভাবকদের টার্গেট করে গত এক মাসে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে প্রতারক চক্র। ফোনে তারা শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যও জানায়। তবে তথ্য ফাঁসের নির্দিষ্ট কোনো উৎস এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেক অভিভাবক টাকা দিলেও লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করছেন না বলে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার বলেন, ‘পুলিশ-ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে টাকা দাবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতারকদের ব্যবহৃত ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।’


