আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
এক সময় যে নদীগুলোর বুক চিরে চলত বড় বড় পালতোলা নৌকা, আজ সেখানে চাষ হচ্ছে বোরো ধান। পানির বদলে মাইলের পর মাইল কেবল বালুর স্তূপ। উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলায় নদনদীর নাব্য হ্রাস পেয়ে এখন নাভিশ্বাস দশা। উলিপুর উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ১৬টি নদনদীর মধ্যে ১১টিই এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার মতো বড় নদীগুলোও এখন কেবল মানচিত্রের রেখা হয়ে টিকে আছে।
সরেজমিন হাতিয়া অনন্তপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় বিশাল বালুর চর পড়ে নদীর মুখটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পানির স্রোত থেমে গিয়ে নদী এখন যেন খেলার মাঠ। মানুষ হেঁটে নদী পারাপার হচ্ছে। অনন্তপুর গ্রামের কৃষক মোঃ মজিবর রহমান (৫৫) আক্ষেপ করে বলেন, ‘গতবার এখানে তাল সমান পানি ছিল, এবার সেখানে বালুর স্তূপ। বাধ্য হয়ে বোরো আবাদ করছি।’ অনন্তপুর ঘাটের ইজারাদার মোঃ হামিদুর রহমান জানান, নদী মরে যাওয়ায় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নদীকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহকারী শত শত মাঝি ও মৎস্যজীবী পরিবার এখন চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছে।
নদীগুলোর এই দশার পেছনে উজানের প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান জানান, গত তিন দশক ধরে ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে বসতি গড়ার ফলে বর্ষায় পানির সঙ্গে প্রচুর নুড়িপাথর ও বালু বাংলাদেশে আসে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, সোনাভরি, বুড়িতিস্তাসহ ১১টি নদী ইতোমধ্যে অস্তিত্ব হারিয়েছে। ধরলা ও তিস্তাও এখন চরম সংকটে। খনন বা ড্রেজিং ছাড়া এই নদীগুলো উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবুল কালাম আজাদ জানান, এক সময়কার প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র এখন শীর্ণ এক নালায় পরিণত হয়েছে। গাইবান্ধা থেকে চিলমারী হয়ে ভারতের আসাম পর্যন্ত যে আন্তর্জাতিক নৌরুটটি ছিল, তা কাগজে-কলমে চালু থাকলেও বাস্তবে নাব্যর অভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া হাতিয়া প্যারারচর, অনন্তপুর সাহেবের আলগা, পালের ঘাট থেকে বেগমগঞ্জ, মেকুরের আলগা, গেন্দার আলগা, ফকিরের চর, পানিয়ালের ঘাট, নাগড়াকুড়া ঘাট, বজরা ঘাট, থেতরাই ঘাট, হাতিয়া গেন্দার আলগাসহ ১৫টি রুটে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ১৬ কিলোমিটার প্রস্থের ব্রহ্মপুত্র এখন বালুর প্রভাবে কোনো কোনো জায়গায় মাত্র আধাকিলোমিটারে ঠেকেছে।
চিলমারী রমনা ঘাটের ম্যানেজার মোঃ সিদ্দিক হোসেন জানান, নদীর নাব্য হ্রাস পাওয়ায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক নৌরুটে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই রুটে বড় জাহাজগুলো নিয়মিত চলাচল করলে নদীর নাব্য স্বাভাবিক থাকে এবং নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রমও অব্যাহত থাকে, যা স্থানীয় নৌ চলাচলের জন্যও সহায়ক।
রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণেই তিস্তা ও ধরলা শুকিয়ে গেছে। নদীগুলোর বিজ্ঞানসম্মত খনন ও নিয়মিত পরিচর্যা না থাকায় উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ও অর্থনীতি আজ হুমকির মুখে।


