মোঃ মাহাবুল ইসলাম মুন্না গোদাগাড়ী রাজশাহী :
রাজশাহীর সীমান্তে মাদকের ‘কালো সাম্রাজ্য’ ভাঙতে ডিএনসির নতুন অস্ত্র, মানি লন্ডারিং মামলায় জব্দ হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ, আতঙ্কে সীমান্তের গডফাদাররা
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই মাদক চোরাচালান, হুন্ডি ও সোনা পাচারের অন্যতম আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে গোদাগাড়ী ও এর আশপাশের সীমান্ত এলাকা এখন অপরাধ সিন্ডিকেটের নিরাপদ করিডোরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর মাদকের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও এবার সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন আনছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
সাধারণত সিআইডি বা দুদকের বহুল ব্যবহৃত ২০১২ সালের ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন’ এবার নিজেদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে ডিএনসি। মাদকের টাকায় গড়া কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও সরকারের অনুকূলে নেওয়ার নজিরবিহীন এই অভিযানে এখন চরম আতঙ্কে রয়েছেন সীমান্ত অঞ্চলের শীর্ষ মাদক কারবারিরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিএনসির রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলী আসলাম হোসেনের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে ৮টি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলার তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে।
যাদের বিরুদ্ধে মামলা, যেসব সম্পদ জব্দ : গোদাগাড়ীর সহড়াগাছী-মাটিকাটা এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মো. আব্দুল্লাহ (৬০) ও তার স্ত্রী মোসা. সায়েরা বেগমের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। তাদের প্রায় ২০০ শতক জমি, ১৭৪ শতক ফসলি জমি এবং ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৬৪ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের আলিশান বাড়িও সিলগালা করেছে প্রশাসন।
এছাড়া গোদাগাড়ীর মাদারপুর এলাকার মোঃ তারেক হোসেনের প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। এর আগে তিনি প্রায় সাড়ে ৬ কেজি হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন। উদ্ধার হওয়া হেরোইনের বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। বর্তমানে সে জেলে আছেন তবে তার ব্যবসা থেমে নাই
ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, গোদাগাড়ী রেলগেট মইশালবাড়ি মাদারপুর এলাকার শহীদুলসহ আরও কয়েকজন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে তাদের বিপুল সম্পদের তথ্যও প্রকাশ করা হবে।
“মাদকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙতে হবে” ডিএনসির বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. লোকমান হোসেন বলেন, আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট তদন্তের ভিত্তিতেই সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলী আসলাম হোসেন বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে না দিলে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। আমরা পর্যায়ক্রমে রাজশাহীর বাকি গডফাদারদেরও এই আইনের আওতায় আনব।”
সীমান্তে ভয়ংকর বাস্তবতা : অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে র্যাব-৫ এবং ডিএনসি ধারাবাহিকভাবে বড় বড় মাদকের চালান জব্দ করলেও চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কয়েক মাস আগে নগরীর বোয়ালিয়া থানার খড়বনা এলাকায় র্যাব-৫ মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে স্থানীয় কিছু অসাধু নেতা ও মাদক কারবারি সংঘবদ্ধ হয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেয়। পরে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা চাপের কারণে অনেক সময় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মাদক সিন্ডিকেটগুলো দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
আতঙ্কে মাদক গডফাদাররা : ডিএনসির এই ‘সম্পদ ক্রোক’ অভিযান শুরু হওয়ার পর সীমান্ত এলাকার মাদক কারবারিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে দ্রুত জমি-বাড়ি বিক্রির চেষ্টা করছেন, আবার কেউ কেউ সম্পদ পরিবারের সদস্যদের নামে ভাগ করে দিচ্ছেন। এমনকি আইন ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বড় আইনজীবীদের দ্বারস্থ হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্বস্তি ফিরছে সাধারণ মানুষের মাঝে দীর্ঘদিন পর প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গোদাগাড়ী কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “এতদিন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পেত না। প্রতিবাদ করলেই বিভিন্ন ভাবে এমনকি বাড়িতে মাদক ফেলে করা হতো হয়রানি । এবার ডিএনসি তাদের টাকার উৎসে আঘাত করেছে। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।”


