এসকে হেলাল :
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট ও জ্বালানি সংকটের ঢেউ আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের যে প্রস্তাবনা সামনে এনেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক ও সময়োপযোগী মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের পূর্বাভাস। বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদ ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত আশীর্বাদের চেয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবেই বেশি দেখা দিচ্ছে।
অনলাইন ক্লাসের প্রধান শর্ত হলো উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং উপযুক্ত ডিজিটাল ডিভাইস। অথচ বাংলাদেশের রূঢ় বাস্তবতা হলো, আজও গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ এই সুবিধার বাইরে। অনেক পরিবারে সাধারণ ফিচার ফোন থাকলেও মানসম্মত স্মার্টফোন কেনা তাদের কাছে আজও বিলাসিতার নামান্তর। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে একজন শ্রমজীবী মানুষের সন্তানের জন্য ৫-১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ডিভাইস কেনা প্রায় অসম্ভব। ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে, অপরিকল্পিত ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লার্নিং লস বা শিখন ঘাটতি তৈরি করে। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে সামর্থ্যবানরা প্রযুক্তির সহায়তায় এগিয়ে যাবে আর দরিদ্র মেধাবীরা কেবল সরঞ্জামের অভাবে পিছিয়ে পড়বে।
ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাবের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে ঝুঁকিটি এখানে দৃশ্যমান, তা হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি-আসক্তি। পড়াশোনার প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার অপব্যবহার রোধ করা অভিভাবক বা শিক্ষকদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। দেখা যায়, অনলাইন ক্লাসের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ইন্টারনেটে ডুবে থাকছে এবং অভিভাবকের অগোচরে বিভিন্ন ক্ষতিকর গেম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এই আসক্তি কেবল তাদের মেধার বিকাশই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের মানসিক ভারসাম্য ও জীবনের লক্ষ্য পর্যন্ত ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রযুক্তির এই অন্ধকার গলিতে পা বাড়িয়ে অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ অকালেই ঝরে পড়ছে, যা একটি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যে লক্ষ্য নিয়ে এই পরিকল্পনা, সেই বিদ্যুতের অভাবে যদি শিক্ষার্থীর ডিভাইসটি চার্জহীন থাকে কিংবা নেটওয়ার্ক টাওয়ার অকেজো হয়ে পড়ে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি স্ববিরোধী অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া মেগাসিটিগুলোতে যানজট নিরসন বা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার যে বৈষয়িক সুফল, তার চেয়ে গ্রামের একটি মেধাবী শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার মাশুল অনেক বেশি। সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার অভাবে শিক্ষার্থীদের সামাজিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকলে গ্রামীণ জনপদে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
এই সংকট নিরসনে কেবল অনলাইন ক্লাসের ওপর নির্ভর না করে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী পথে হাঁটতে হবে। প্রথমত, ঢালাওভাবে সারা দেশে একই নিয়ম কার্যকর না করে জোন-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে; অর্থাৎ যেখানে ডিজিটাল সুবিধা নেই, সেখানে সরাসরি ক্লাস চালু রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে সাপ্তাহিক ছুটি ২ দিনের পরিবর্তে ৩ দিন করা এবং বাকি ৪ দিন সশরীরে নিবিড়ভাবে ক্লাস পরিচালনা করা। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ও পরিবহণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে, আবার শিক্ষার্থীরাও প্রযুক্তির কুফল থেকে মুক্ত থাকবে। তৃতীয়ত, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচী পরিবর্তন করে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত করা যেতে পারে।
সবশেষে, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা যেন সর্বজনীন ও নিরাপদ হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হলেও শিক্ষার সমতা ও শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে তা করা কাম্য নয়। নীতিনির্ধারকদের উচিত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা। শিক্ষার আলো যেন কেবল শহরের বৈদ্যুতিক বাতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন নিরাপদ ও সুস্থভাবে পৌঁছে যায় কুঁড়েঘরের টিমটিমে প্রদীপেও।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সংগঠক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


