এসকে হেলাল :
কালচক্রের অমোঘ আবর্তনে জীর্ণতাকে ঝরিয়ে প্রকৃতিতে আবারও রাজসিক বেশে ফিরে এসেছে বৈশাখ। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব কেবল তারিখ বদলের হিসাব নয়, বরং এক আত্মিক নবায়নের মহোৎসব। তবে এবারের বৈশাখ কেবল ঋতু পরিবর্তনের এক প্রথাগত বার্তা নিয়ে আসেনি; এসেছে এক দীর্ঘশ্বাসময় অস্থির সময়ের অবসান আর হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত ক্ষতগুলো মুছে ফেলার পরম প্রার্থনা হয়ে। কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে যে আকুলতা ধ্বনিত হয়, তা আজ আমাদের প্রত্যেকের সামাজিক ও জাতীয় জীবনের সমান্তরাল এক আর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বৈশাখ মানেই তো নতুনের আবাহন, কিন্তু সেই নতুনের তিলক পরার আগে পুরোনো জঞ্জাল পরিষ্কার করা আজ সময়ের দাবি।
গত বছরের দিনলিপি ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই একরাশ বিষণ্ণ ধুলো আর দীর্ঘশ্বাসের স্থিরচিত্র। আজ বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন আজ রুদ্ধশ্বাস। আমরা যেন এক নিরন্তর দহনকাল অতিক্রম করছি। জনপদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তার ধূসর মেঘে ঢাকা পড়েছে আমাদের সোনালি ভবিষ্যৎ। প্রতিদিনের মিছিলে মিছিলে যে কোলাহল আমরা দেখি, তাতে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া ভার; সেখানে কেবলই টিকে থাকার এক রুক্ষ ও যান্ত্রিক লড়াই। অস্থিরতার এই তপ্ত বালুচরে শান্তি আজ এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্র হয়ে দূর আকাশ থেকে আমাদের অসহায়ত্ব অবলোকন করে। মানুষের মধ্যকার অকৃত্রিম বিশ্বাসগুলো আজ অনেকখানি ফিকে হয়ে গেছে; সেখানে স্থান করে নিয়েছে স্বার্থপরতা আর অবিশ্বাসের কালো ছায়া। এই ক্লান্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ আজ চেনা পৃথিবীর পরম মমতা আর আশ্রয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
বাঙালি মানসে বৈশাখের চিরন্তন রূপ হলো ‘রুদ্র’। কিন্তু এই রুদ্রতা বিনাশের জন্য নয়, বরং জঞ্জাল সাফ করে শুদ্ধিকরণের জন্য। তপ্ত দুপুরে যখন কৃষ্ণচূড়ার ডাল রক্তিম আভায় সেজে ওঠে, তখন তা কেবল প্রকৃতির রূপ হয়ে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং নতুন করে বাঁচার দুর্মর প্রেরণা। বৈশাখী ঝড় তার প্রলয়নাচনে সমাজের বুক থেকে সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা আর অন্ধত্বের সকল ক্ষত ধুয়ে মুছে নিয়ে যাক। অস্থিরতার যে লোহা-শৃঙ্খল আমাদের মানবিকতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, সেই শৃঙ্খল ভাঙার গান গাইতে হবে এই বৈশাখেই। মানুষের চোখে আজ সংশয়ের ছায়া নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের অঞ্জন বা প্রলেপ মাখা জরুরি। যে আগুনের পরশমণি দিয়ে বৈশাখ আসে, সেই আগুন যেন আমাদের অন্তরের ভেতরের সব মলিনতা পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চারপাশে অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণার চর্চা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সর্বত্রই যেন এক বিভেদের সুর। আমাদের যাপিত জীবনের গহীনে জমে থাকা এই ঘৃণা ও বিদ্বেষের স্তূপ আজ বৈশাখী কালবৈশাখীতে ছাই হয়ে উড়ে যাওয়া প্রয়োজন। ধরণীর বুকে সেই হারানো স্নিগ্ধতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রকৃত হৃদয়ের বন্ধন। ফসলের সোনালি ঘ্রাণে যেমন কৃষকের স্বপ্ন থাকে, শ্রমিকের ললাটের ঘামে যেমন জাতির সমৃদ্ধির ইতিহাস থাকে, আর শিশুর অমলিন নিষ্পাপ হাসিতে যেমন আধ্যাত্মিক পবিত্রতা থাকে—সেই শাশ্বত বাংলার রূপটিই হোক আমাদের আগামীর পাথেয়। প্রতিটি স্পন্দনে ধ্বনিত হোক কেবলই সাম্য আর প্রশান্তির অবিনাশী সুর।
বৈশাখ আমাদের শেখায় শেকড়ের কাছে ফিরে যেতে। আজ যখন বিশ্বায়নের আগ্রাসনে এবং ভিনদেশি অপসংস্কৃতির ভিড়ে আমরা দিশেহারা, তখন বৈশাখী চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের কথা। মঙ্গল শোভাযাত্রার বর্ণিল রঙ কেবল রাজপথের সৌন্দর্য নয়, তা আমাদের মনোজগৎকেও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে রঙিন করে তোলে। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়ানোর যে অনন্য শিক্ষা বৈশাখ দেয়, তা যদি আমরা আমাদের কর্মজীবনে ধারণ করতে পারি, তবেই সমাজ থেকে অনাচার ও বৈষম্য দূর করা সম্ভব। বৈশাখী মেলা কেবল পণ্যের সমাহার নয়, বরং তা হলো প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে নাগরিক জীবনের এক নিবিড় মিলনমেলা, যা আমাদের জাতীয় সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করে।
পরিশেষে, বৈশাখ মানেই কেবল মেলা, লোকসংগীত বা পান্তা-ইলিশের বাহ্যিক প্রথা নয়। এবারের বৈশাখ হোক এক অমলিন শপথের নাম—একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ার শপথ। যে শপথে প্রতিহিংসা থাকবে না, থাকবে না কোনো সংশয় বা ভীতি। আমরা এমন এক নতুন বছর চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার আপন মহিমায় নির্ভয়ে ও শান্তিতে শ্বাস নিতে পারবে। পুরাতন বছরের জীর্ণ পাতা ও ধুলোবালি মুছে দিয়ে নতুন বৈশাখ আমাদের হৃদয়ে হৃদয় মেলানোর সেতু নির্মাণ করে দিক। এই অস্থির সময়ের বুকে শান্তি আর সাম্যের বিজয়পতাকা ওড়াতে পারলেই সার্থক হবে আমাদের নববর্ষের আয়োজন। রুদ্র বৈশাখ তার পবিত্র তেজে আমাদের মনকে পরিশুদ্ধ করুক, সকল ক্ষত শুকিয়ে উঠুক নতুনের সজীবতায়। জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার।
শুভ নববর্ষ!
লেখকঃ কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সংগঠক
চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


