সিরাজুল ইসলাম রনি, রাজশাহী :
রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজারে সেনাবাহিনীর সৈনিক পরিচয় দিয়ে জাল টাকার নোট দিয়ে অভিনব কায়দায় স্বর্ণের চেইন প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনায় দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, মোঃ রিয়াজুল ইসলাম (যিনি নিজেকে সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন) এবং স্বর্ণের ক্রেতা ও ‘মা জুয়েলার্স’-এর মালিক মোঃ রোমান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং এসআরবি-১, উত্তরা, ঢাকার সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় রাজশাহী ও বগুড়ায় প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত দুটি স্বর্ণের চেইনসহ একটি মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন সাহেববাজার এলাকায় ‘আশা জুয়েলারি স্টোর’-এর মালিক মোঃ রাসেদুল ইসলাম ও তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে স্বর্ণের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটে একব্যক্তি দোকানে এসে নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক বলে পরিচয় দেন।
তিনি জানান, তাঁর ‘মেজর স্যারের’ মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে স্বর্ণের গহনা কিনতে হবে। প্রথমে তিনি ৭০০ টাকা দিয়ে একটি নাকফুল কিনে নেন এবং আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন পছন্দ করে জানান যে, পরবর্তীতে টাকা পরিশোধ করে সেটি নিয়ে যাবেন।
পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ের ধারাবাহিকতায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ওই ব্যক্তি পুনরায় দোকানে এসে সেই স্বর্ণের চেইনটি নিতে চান। দোকানে ওই মাপে চেইন প্রস্তুত না থাকায় তারা পাশের ‘বিশ্বনাথ জুয়েলার্স’ থেকে ২২ ক্যারেটের আট আনা এক পয়েন্ট ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন এনে তাঁকে দেন, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
চেইনটি হাতে নিয়ে ওই ব্যক্তি ১ হাজার টাকা মূল্যমানের ১১৫টি নতুন নোট পরিশোধ করেন। দোকান মালিকের বাবা নোটগুলো যাচাইয়ের জন্য পাশের অন্য একটি দোকানে নিয়ে গেলে সেগুলো জাল বলে শনাক্ত হয়। কিন্তু দোকান থেকে ফিরে এসে মালিকপক্ষ দেখতে পান প্রতারক ওই ব্যক্তি ততক্ষণে চম্পট দিয়েছেন। এভাবে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার জাল নোট গচিয়ে স্বর্ণের চেইনটি হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণে সাফল্য
এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জনাব মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির পিপিএম-এর নির্দেশনায় বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ছায়াতদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি এবং আরএমপির সিসি ক্যামেরা টিমের সহায়তায় বিভিন্ন পয়েন্টের সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আসামির সুনির্দিষ্ট গতিবিধি শনাক্ত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এসআরবি-১, উত্তরা, ঢাকার সহযোগিতায় ঢাকার খিলক্ষেত থানাধীন জামতলা মোড় এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মোঃ রিয়াজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজুল ইসলাম ঝালকাঠি জেলার সদর থানাধীন উত্তর মারাবাটি গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। বর্তমানে তিনি ডিএমপির খিলক্ষেত থানাধীন টানপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য ও বগুড়ার ঘটনা
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজুল স্বীকার করেন যে, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা স্বর্ণের চেইনটি তিনি ঢাকার খিলক্ষেতের জামতলা মোড় এলাকার ‘মা জুয়েলার্স’-এর মালিক মোঃ রোমানের কাছে বিক্রি করেছেন। রোমানের বাড়ি কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন লড়িবাগ গ্রামে, তাঁর বাবার নাম আলফু মিয়া।
রিয়াজুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ‘মা জুয়েলার্স’-এ অভিযান চালিয়ে দোকান মালিক মোঃ রোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর হেফাজত থেকে রাজশাহীর ‘আশা জুয়েলারি স্টোর’ থেকে আত্মসাৎ করা স্বর্ণের চেইনটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজুল ইসলাম একই কৌশলের আশ্রয় নিয়ে গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বগুড়ার নিউ মার্কেটের স্বর্ণপট্টিতে অবস্থিত ‘তামান্না জুয়েলার্স’ থেকেও ১ লাখ ২২ হাজার টাকার জাল নোট দিয়ে আট আনা তিন রতি তিন পয়েন্ট ওজনের আরও একটি স্বর্ণের চেইন প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করেছিলেন। বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ বগুড়ায় আত্মসাৎ করা ওই চেইনটিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ১৪ হাজার ৯৭২ টাকা জব্দ করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কৌশলে অভিনব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানা এবং ডিএমপির খিলক্ষেত থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ।


