আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
বাইরে তখন বৃষ্টি। ঘরের ভেতরেও টুপটাপ পানি পড়ছে। পানি ঠেকাতে জরাজীর্ণ টিনের চালে পলিথিন বিছিয়ে রেখেছেন বাসিন্দারা। কোথাও ভেঙে গেছে বেড়া, কোথাও নষ্ট হয়ে গেছে টয়লেট। বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় আশ্রয়ের জন্য নির্মিত ঘরগুলোই এখন হয়ে উঠেছে দুর্ভোগের কারণ।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের চর-গোরকমণ্ডল এলাকার আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের চিত্র এটি। বিভিন্ন সময়ে এসব প্রকল্পের আওতায় ৩৭৫টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিনের অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে অনেক ঘরই এখন বসবাসের অনুপযোগী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৩-০৪ সালে গোরকমণ্ডলে দুটি আবাসনে ১৬০ ও ৮০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০১০-১১ সালে দক্ষিণ চর-গোরকমণ্ডলে আরও ৫৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। পরে ২০১৯-২০ সালে ধরলা নদীর পশ্চিম ও পূর্ব পাড়ে যথাক্রমে ৬০ ও ২০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়।
কয়েক বছর পর থেকেই এসব ঘরের টিনের চাল ও বেড়ায় নষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমানে অনেক ঘরের চাল ফুটো হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। অনেকে পলিথিন দিয়ে ছাদ ঢেকে কোনোরকমে বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক টিউবওয়েল ও টয়লেটও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
আবাসনের বাসিন্দা মোছাঃ জান্নাতী বেগম (৫০), মোছাঃ আসমা বেগম (৪০) ও মোছাঃ মনোয়ারা বেগম (৪৫) বলেন, তাঁদের দুর্ভোগের কথা সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বৃষ্টি হলে পলিথিন দিয়ে পানি ঠেকিয়ে থাকতে হয়। অন্য কোথাও জায়গা না থাকায় জরাজীর্ণ ঘরেই থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
দক্ষিণ চর-গোরকমণ্ডল আনন্দবাজার আবাসনের বাসিন্দা মোছাঃ জরিনা বেগম জানান, বরাদ্দ পাওয়া সরকারি ঘরটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিজ উদ্যোগে নতুন ঘর তৈরি করে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
আবাসনের আরেক বাসিন্দা মোঃ বাদশা মিয়া কামারের কাজ করে সংসার চালান। তাঁর ভাষ্য, কাজ থাকলে কোনোভাবে সংসার চলে, কাজ না থাকলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। আবাসনের বাসিন্দা পেয়ারা খাতুন জানান, ২০টি পরিবারের জন্য ঘর বরাদ্দ থাকলেও সেখানে এখন ৮-৯টি পরিবার বসবাস করছে।
গোরকমণ্ডল আবাসনের সভাপতি মোঃ মোনাফ হোসেন বলেন, ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে আবাসন সংস্কারের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তাঁরা। একাধিকবার আশ্বাস মিললেও সংস্কারের কাজ হয়নি। জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে দুটি আবাসনের ১৭৫টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে বলেও জানান তিনি।
শুধু পুরোনো আবাসন নয়, তুলনামূলক নতুন প্রকল্পের ঘরেও দেখা গেছে একই চিত্র। ২০১৯-২০ সালে ধরলা নদীর পশ্চিম পাড়ে ৬০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে সেখানে ৮-১০টি পরিবার বসবাস করছে। পূর্ব পাড়ের ২০টি ঘরের মধ্যে ৮-৯টি পরিবার রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে অনেক ঘরই এখন খালি পড়ে আছে।
এ বিষয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ সিরাজউদ্দৌলা বলেন, আবাসন ও গুচ্ছগ্রামগুলোর সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে বসবাসরত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে নির্মিত এসব আবাসন এখন সংস্কারের অপেক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত ঘরগুলোর সংস্কার, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যটি আবারও কার্যকর হবে।


