আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
সারি সারি বেঞ্চ। অথচ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী মাত্র একজন। বই হাতে একা বসে আছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি আক্তার। শিক্ষকের অপেক্ষায় থাকলেও বেশ কিছুক্ষণ পরও শ্রেণিকক্ষে আসেননি কোনো শিক্ষক। পাশের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে গল্প-আড্ডা ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
কোনো কক্ষে এক শিক্ষিকা নিজের শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছেন। পাশে থাকা অন্য শিক্ষিকারা ব্যস্ত পারিবারিক আলাপচারিতায়। সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী—এমন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ি গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায়।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির নথিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮৮ জন। এর বিপরীতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন—শিক্ষক ১৪ জন এবং কর্মচারী পাঁচজন। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা।
নথিতে ১৮৮ শিক্ষার্থী, উপস্থিত মাত্র একজন। মাদ্রাসার তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণিতে ২২ জন, ষষ্ঠে ২৪, সপ্তমে ২৭, অষ্টমে ৩৪, নবমে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। সব মিলিয়ে নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন।
তবে সরেজমিনে অষ্টম শ্রেণির কক্ষে মোছাঃ বৃষ্টি আক্তার ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়নি।
মোছাঃ বৃষ্টি আক্তার জানায়, “আমরা মাদ্রাসায় প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন করে আসি। ক্লাস বেশি হয় না। তাই শিক্ষার্থীও আসে না।”
তার বক্তব্যে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দাখিল পরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন:
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী উপস্থিতির পাশাপাশি সাম্প্রতিক দাখিল পরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় এ মাদ্রাসা থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র দুজন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। এ সময় তাদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
সাবেক শিক্ষার্থী মোঃ সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাস করার পর তিনি অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছেন। এ জন্য তাকে অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
মাদ্রাসার শিক্ষক মোঃ সামছুল হক বলেন, “মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। সেটা সবাই জানে।”
সহকারী সুপার মোঃ আব্দুস সুবহান বলেন, “মাদ্রাসাটি তিস্তা নদীর পাশে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।”
সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ শাহালম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকেই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল।
মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোঃ লাল মিঞা সরকার বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি অবগত। নদী এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, আগামীতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাদ্রাসামুখী করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, “দুই-একদিনের মধ্যে পরিদর্শন করাবো। সমস্যা পাওয়া গেলে অবশ্যই রিপোর্ট করে পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি:
বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসাটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠানটির EIIN নম্বর ১২২৫১৭ এবং ইনস্টিটিউশন নম্বর ৮৮০৭০৫২১০২।
নথিতে ১৮৮ শিক্ষার্থী, ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী এবং মাসে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা—এর বিপরীতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর এমন অনুপস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।


